Monday, November 12, 2018

খামহীন

সুপ্রিয়…
কী বলে সম্বোধন করব, এখন সেটা নিয়েও দ্বিধায় ভুগি। এক কালে তো আমার মালিকই তুমি ছিলে। যেহেতু এখন তুমি সাবেক হওয়ার পথে, তাই আমিও তোমায় শ্রদ্ধেয় থেকে সুপ্রিয়তেই নামিয়ে দিলাম বলা যায়। অপ্রিয় হতেও বেশি বেগ পেতে হবেনা আশা করি।
যেহেতু চলে যাচ্ছি, তাই ভাবলাম একটা চিঠি লিখেই যাই। কী ভেবেছিলে? আমি লিখতে জানিনা? অবশ্য সবাই সেটাই ভাবে। 
Image source: Google

পুনর্জন্ম কিংবা পূর্বজন্ম বলতে কিছু আছে কিনা, তা আমার জানা নেই; তবে জন্ম থেকেই তোমার সাথে আছি এতটুকু আমার বিশ্বাস করতে ভাল লাগে। তোমার সাথেই তো বড় হলাম। অবশ্য তোমার শারীরিক বৃদ্ধিটা তো সময়ের হাত ধরেই হয়েছে। ঠিক সময়ে আমি তোমার হাত না ধরলে মানসিক বৃদ্ধি হত কিনা, সন্দেহ আছে।
কতবার তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করেছিলাম, তা কি তুমি জানো? জানা দরকার কিনা জানিনা, তবে জানিয়ে দিতে খুব ইচ্ছে করছে।
মনে পড়ে, যখন তুমি দীর্ঘদিনের চলে আসা বন্ধুত্ব কে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে শুরু করলে? বন্ধুত্ব তো অন্ধত্বের জনক হয়ে গিয়েছিল। তোমার সেই শ্রেষ্ঠ বন্ধুকে আমি বোকা ভেবেছিলাম। বোকা ভাবার জন্যেই এত বারবার তাকে তুমি সুযোগ দেয়ার পরেও আমি তোমাকে পিছন থেকে টানিনি। ভেবেছিলাম, এই বন্ধুত্বের বন্ধনের উপরে তো কিছু নেই! এটা অনেক দামী। এবং দাম এর ভিত্তি? সেটা ছিল সময়ের স্রোত। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধুত্ব আছে, তাই এটা দামী। একে অপরের দোষগুলোকে মেনে নাও, অপরাধ গুলোকে লুকিয়ে যাও, আবার সেই একই দোষ অন্য কেউ করলে তাকে শাস্তি দিতে চাও (সুবিচার একটু দূরে), সেটাই তোমার বন্ধুত্বের দাম বাড়াতে থাকে দিনে দিনে। একচোখা হয়ে যাও একজনের জন্য, এটাই বন্ধুত্বের দাম। আর কেনই বা একচোখা হচ্ছিলে? কারণ, বন্ধুত্ব অনেকদিনের। যেহেতু অনেকদিনের, তাই শক্ত। ভাঙ্গার কথা চিন্তা করাও মহাপাপ।
তুমি যখন একেকটা দোষ করতে চাইতে কিন্তু বিন্দু বিন্দু মানবিক বোধের কারণে করার আগে দুবার হলেও অপরাধ করার আগেই অপরাধবোধে ভুগতে, তখন তোমাকে দোষ করার জন্যই উৎসাহ দিত তোমার সেই বন্ধু। তোমার সব ভুল কে ঠিক বলে মানত সে। আর শুধরাতে চাইতাম আমি। তাই আমার থেকে বেশি ভাল লাগা শুরু করল সেই বন্ধুকেই।
ঠিক একইভাবে তোমার বন্ধু কোনো অপরাধ করতে চাইলে অগ্রিম বাহবা দিতে ছাড় দিতে না তুমি। কারণ বন্ধুত্বে অন্যের ভুলগুলো মেনে নেয়া দায়িত্ব। ভুল শুধরানোর কথা চিন্তাই করতে হয় না। “ও যেমন আছে, তেমনই আমার বন্ধু”; এটা ভুলের ক্ষেত্রে খাটে, অপরাধের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভয়ানক। তুমি তো ধীরে ধীরে সেই বুদ্ধিও হারাতে থাকলে।
ভাল হোক, খারাপ হোক, বন্ধু তো! ব্যাস! সাত খুন মাফ। আট নাম্বারেও দোষ হবে বলে মনে হয়না।
তোমার বন্ধুকে অপরাধী ভাবতাম আমি, আর তুমি ভাবতে নিষ্পাপ বোকামি। কিন্তু বোকামী আর অপরাধ, দুটোই যে ক্ষতিকর, সেটা বুঝলাম শুধু আমি।
আমি খুব করে চেয়েছিলাম, তোমাকে ছেড়ে চলে যাব। কিন্তু যাইনি। ছাড়লাম নিজের আত্মসম্মানবোধকে
মনে পড়ে, যখন তোমার প্রেমিকা হলো? যাকে পেয়ে তুমি দিনে রাতে “মেইড ফর ইচ আদার” ভেবে ভেবে ভিতরে ভিতরে গর্বিত হতে? তোমার ভিতরকার গর্ব হয়তবা আমার থেকে ভাল আর কেউ জানেনা। সে যাই হোক। আমি তোমাকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম, যেই সম্পর্কে এত অ্যাডজাস্টমেন্টের প্রশ্ন আসে এবং যেটা তোমার ব্যাক্তিত্বকেই পাল্টেটে দিচ্ছে, সেটাকে নিয়ে এত টানাটানি কেন? নিজের বহুদিনের পালন করা স্বপ্ন আজ নতুন এক বাস্তবে উপস্থিত জলজ্যান্ত জীবের জন্য পালটে দিতে চাও, যে যেকোনো মুহূর্তেই মরিচীকার রুপ নেয়ার ক্ষমতা রাখে। নাহ, সেটাও তোমার চোখে পড়েনি।
প্রেম তো অন্ধ হয়!
তোমার চোখে পড়ল, এগুলো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব। একটা সুন্দর সম্পর্ক যখন দুজন মানুষের ভিতরে তৈরি হবে, তখন দুজনেরই দুজনের প্রতি কিছু দায়িত্ব থাকে। আর এই “দায়িত্বের” নাম করেই একের পর এক নিজের স্বাতন্ত্র্য কে বিসর্জন দেয়া শুরু করলে তুমি; নিজেকে ভেঙ্গে অন্য রূপ দিয়ে দিলে, যাকে আমি কী, তুমি নিজেই চিনতে পারো কিনা সন্দেহ! হয়তবা তখন তোমার চোখে দায়িত্বের চশমা ছিল। হয়তবা সেই চশমা তোমাকে সবকিছুই আগের মত দেখতে দেয় আর ভেতর থেকে অন্যরকম একটা শান্তি দেয়া শুরু করে যেটার কথা ভেবে ভেবে তুমি এই দায়িত্ব নেয়াকেই সঠিক জীবনের পথ ভাবতে শুরু করে দাও।
তোমার স্বাতন্ত্র্য চলে যাচ্ছে! এটা দায়িত্ব!
তোমার জীবনে নিজের স্বাধীনতা চলে যাচ্ছে! এটা দায়িত্ব!
তোমার নিজের দিন শেষের একা থাকার গুরুত্বপূর্ণ সময়টা চলে যাচ্ছে। এটা দায়িত্ব!
যখন নিজের ভেতর থেকেও বুঝতে পারলে যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছ তুমি, তখন হয়ত নিজেকেই সান্ত্বনা দেয়ার জন্য আওড়ানো শুরু করলে, “প্রত্যেক সম্পর্কেরই কিছু দায়িত্ব থাকে। এগুলো আমার দায়িত্ব।“
আমি সেদিনও খুব করে চেয়েছিলাম, তোমাকে ছেড়ে চলে যাব। কিন্তু যাইনি। আরেকটিবার ছাড়লাম নিজের আত্মসম্মানবোধ কে।
এবারও ভাবছ, আমার আত্মসম্মান কীসে?
তুমি যেন আমাকে ধরে রাখতে পারো সেজন্য তোমাকে যতবার ছেড়ে যাবার কথা চিন্তা করেছি ততবারই তোমার মত “দায়িত্বের” চশমা পরে নিজেকে নতুন করে বোঝাতে শুরু করতাম।
আজ বুঝি।
নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়েছি আমি। বারবার ভুল করা একটা মানুষের মাথায় জেঁকে থেকে যাওয়ার চেষ্টা করেছি।
এবার অনেক হয়ে গিয়েছে। আমি আর চেষ্টা করতে চাচ্ছিনা। অনেক তো করলাম। করিনি?
এই শেষ চিঠি; এবং এটাই প্রথম।
চলে যাচ্ছি আমি।
আর আসব কিনা জানি না। হয়তবা তোমার অন্ধত্ব ঘুচলে আমাকে তুমি নিজেই খুঁজে পাবে। তোমার ভিতরেই কোথাও না কোথাও থেকে যাব আমি। আমার তো আর ভেতর বা বাহিরের জগত বলতে কিছু নেই। তুমিই মালিক আর তুমিই বাসস্থান। তোমাকে অনেকদিন ধরে রেখে মাঝে মাঝে “ইগোয়িস্টিক” গালি শোনা ছাড়া আর কিছু করতে না পারার বিফলতার কষ্টে নিজের অস্তিত্ব লুকাতে অনির্দিষ্টকালের জন্য নীরবতা পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আর কথা না বাড়াই।
ইতি-
তোমার “আত্মসম্মানবোধ”!

 তারিখঃ ৬ই জুন, ২০১৮

No comments:

Post a Comment