Sunday, November 11, 2018

অ(যৌক্তিক) শিক্ষা - আমার চোখে

আমার কেন জানি মনে হয়, আমি এখন যা যা কিছু বলব এইগুলা আমি অনেকবার শুনে এসেছি এবং যতবার-ই শুনেছি ততবারই বক্তা কে শিক্ষিত এবং অযৌক্তিক মনে হয়েছে। শিক্ষিত, কারণ এই বাক্যগুলো অনেকবার ঘুরেফিরে আমাদের রচনা বইতে দেখা যায়, অযৌক্তিক কারণ এগুলো খুব প্রাচীন আমল থেকে চলে আসা কিছু ‘বাণী’ যেগুলোর কোনো যুক্তি আমি খুঁজে পাইনা। অহংকার এর পাহাড়ে দাঁড়ায় এখন সেগুলো নিয়ে একটু বকবক করতে চাই 

১। “লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু”
আমার শোনা এবং চেনা সবচেয়ে বেশি ভিত্তিহীন বাণী হলো এই, “লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু”। আমি জানিনা, তবে মানতে ইচ্ছে হয়, হয়তবা এই বাণীর উপরে ভিত্তি করেই অনেকেই মৃত্যুকে শাস্তি হিসাবে চিন্তা করে। এখন কথা হচ্ছে, মৃত্যু কোনো শাস্তি না। মৃত্যু সবারই অপরিহার্য একটা পরিণতি।
লোভে পাপ, কথাটুকু খুব ভালভাবেই নিতে পারি। কিন্তু, পাপে মৃত্যু? নাহ! পাপেই যদি মৃত্যু হতো, তবে নিষ্পাপ মানুষজন অমরত্ব পেত। মৃত্যু সবার জন্য। বাণী টা যদি, “লোভে পাপ, আর পাপে কিন্তু মহাশাস্তি; ভাল হইয়া যাও!”, টাইপের কিছু বলা হত তবে যুক্তি দেখতে পেতাম।

২। “যারে দেখতে নারি, তার চলন বাঁকা”
খুব খুঁতখুঁতে মানুষ হওয়ার কারণ ছাড়াও মাঝে মাঝে খুব আনবায়াসড হয়েও যখন কোনো অপছন্দের মানুষের ভুল টা ধরি, তখন কথা শুনি, “হ্যাঁ, ওরে তো দেখতে পারো না! তাই এখন ওর সবই খারাপ!”
মানে কী ভাই? এখন বলি, আমি আমার এই দেশের রাজাকারদের দেখতে পারিনা। সহ্য করতে পারিনা তাদের সেই ইতিহাসের কর্মকান্ডগুলো। এখন কি আমি এদের কে দেখতে পারিনা বলে জোর করে এদের সবকিছু খারাপ বানিয়ে দিচ্ছি? কিংবা আমার অপছন্দের মানুষের তো খারাপ কিছুনা কিছু থাকতেই পারে। সেটা আমার মুখ দিয়ে বের করার মানে নিশ্চয় এইটা না যে তাকে দেখতে পারিনা বলেই আমি এসব বকছি।
জানিনা ইউনিভার্সালি কী বলা উচিৎ, তবে একদম (আত্মকেন্দ্রিক)
ব্যক্তিগত পর্যায়ে যদি দেখতে যাই তবে এটাই বলব, “যার চলন বাঁকা, তারে দেখতে নারি”।

৩। “গুরুজনকে সম্মান করো” + “শিক্ষককে শ্রদ্ধা করো”
জ্বি, আমি একটু বেয়াদব। আমি কারো বয়সকে কিংবা পেশাকে সম্মান দেয়া শিখিনি। কেউ শেখায়নি বা শেখানোর চেষ্টা করেনি তা কিন্তু না। নিজ দায়িত্বেই শিখিনি। আগে বয়সে বড় যারা, তাদের কে নিয়ে বলি। ইতিহাস ঘাটলে প্রচুর বিশ্বাসঘাতক বা খুনীর খারাপ কাজের হদীস পাই। ভাল কথা! যাদের কে নিয়ে আজ ইতিহাস পড়ি, তারা আমার বাপ-দাদার থেকেও বয়সে অনেক বড়। কিন্তু তাদের প্রতি আমার কোনো শ্রদ্ধা আসেনা। আমার থেকে শুধু কয়েক বছরের বড় বেশ কিছু ভাই-বোন আছেন। তাদের প্রতি আমার মন থেকে সম্মান আসে। ঠিক তাদেরই বয়সী হলি আপু, রেশমি আলন কিংবা জেসিয়ারা ও আছে। তাদের প্রতি আমার সম্মান আসেনা। তারাও আমার গুরুজন।
আর হ্যাঁ! গুরুজনের মুখের উপরে কথা বলা যেখানে এত বড় একটা অপরাধ, সেখানে তাদের গায়ে হাত তোলা তো মরণ শাস্তি পাওয়ার যোগ্যতা ধরিয়ে দেবার মত ব্যাপার স্যাপার।
অন্তত মাঝে মাঝে মাথায় এই ব্যাপার টা রিলোড করা দরকার যে, ১৯৭১-এ যারা ১৭-২৫ বছর বয়সী মুক্তিযোদ্ধা গুলি করে পাক-হানাদারবাহিনীদের মেরেছিল, সেই হানাদার ‘গুলো’ কিন্তু তাদের বাপের বয়সী ছিল। তারা তাদের ‘গুরুজন’-দের গায়ে হাত (থুক্কু গুলি) ছোঁড়ার জন্যই কিন্তু আমাদের দেশের সূর্যসন্তান হিসাবে বিবেচিত, উখড়ে যাওয়া বেয়াদব হিসাবে নয়।
শিক্ষক; একটা পেশা। চাকরী। এই চাকরী তে ঢুকলেই, ট্যাগ টা পাওয়া মাত্র কিংবা ফরমাল লেটার পাওয়ামাত্রই কেউ ‘শিক্ষক’-এর স্তরের সম্মান পাওয়ার যোগ্য হয়ে যায় না। একজন খারাপ শিক্ষক (ধরি, পরিমল জয়ধর) এর জন্য যেহেতু সমগ্র শিক্ষকজাতি কে খারাপ বলতে পারিনা, ঠিক সেজন্যই একজন ভাল শিক্ষক (ধরি, রেজা স্যার) এর জন্য আমি শিক্ষক পেশাধারী এই সমগ্র জনগোষ্ঠী কে ফেরেশতার পর্যায়ে ফেলতে পারিনা।
এখন তাহলে বলি, সম্মান কাকে দিতে চাই। একজন ভাল কাজ করুক। ভাল মন থেকে ভাল কাজ করুক। সম্মান টা সে কাজের জন্য হোক আর কাজের কাজীর জন্য তো অবশ্যই। সেটা তিনি যেই বয়সের বা যেই পেশারই হোক।

৪। “ এক হাতে তালি বাজেনা” কিংবা “আগে নিজের দোষ দেখো”
যদি কখনও কপাল গুণে আমি সম্পুর্ণ নির্দোষ থাকার পরেও অন্য কারো দোষের জন্য আমার কোনো ক্ষতিটতি হত, যার/যাদের কাছে বিচার নিয়ে যেতাম তারা খুব সুন্দর করে বলত, “তারা নিশ্চয় এমনি এমনি করেনি! নিশ্চয়ই তোমার ও কোনো দোষ ছিল!” আর কেউ কেউ মেঠো বাংলায় বলে দিত, “এক হাতে তালি বাজেনা।”
যখন নতুন নতুন হাইস্কুলে ঢোকার পরে বাবার বদলির সুবাদে নতুন স্কুলে গেলাম, খুব স্বাভাবিকভাবেই প্লে থেকে এক সাথে পড়ে আসা ছেলেদের ফ্রেন্ডসার্কেলে আমার জায়গা করে নেয়াটা রীতিমত কঠিন ছিল। এটা কোনো ক্ষতিকারক বিষয় না যদিও। “বন্ধু নাই!”, এইরকম উত্তর দিয়েছিলাম কোনো এক শিক্ষকের কোনো এক প্রশ্নের বিপরীতে।
আবার কোনো একদিন কিছু ছেলে এসে মাইরা ধইরা চইলা গেলো। হুট করেই। কথা নাই বার্তা নাই। সিক্স কিংবা সেভেনে পড়ি তখন। কারণ হলো, আমি নতুন এসেছি তাদের স্কুলে। আমাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করতেই পারে। কোনো ক্ষতি নাই তাতে।
স্যার এর কাছে শিশুমার্কা হাসি-কান্নামিশ্রিত মুখে গিয়ে বললাম, “ওরা আমাকে মেরেছে!” শাস্তি টাস্তি মনে হয় আমার ই হলো। “তোমার দোষ ও ছিল নিশ্চয়! খুঁজে দেখো আগে!”-এইরকম একটা টপিকের উপরে ব্রেইনস্টর্মিং করার কাজটা ধরিয়ে দেয়া কোনো শাস্তির থেকে কম মনে হয়নি।
স্যার কে এটা বোঝাতে পারলাম না, এক হাত যদি স্থির ও থাকে, আরেক হাত এসে সজোরে বাড়ি দিলেও কিন্তু সশব্দেই তালি বাজে।

শেষ কথাঃ অনেক সময় একজন মানুষ এর মধ্যে কল্যাণকর ভাল ব্যাপার-স্যাপার দেখলে তাদের দেখি অনেকেই, “ফেরেশতার মত মানুষ” হিসাবে প্রশংসা করে। সম্ভবত এটা মনে রাখা উচিৎ যে, আল্লাহ তা’আলা কিন্তু মানুষের মর্যাদা ফেরেশতার উপরের স্তরে রেখেছেন।

সর্বশেষ শেষ কথাঃ কথাগুলোর উৎস, আমার মাথা আর সাপ্লাইয়ার হলো আমার চারপাশ। এই সাপ্লাই হওয়ার পথে যদি কোনো ‘ইম্পিউরিটিজ’ ঢুকে যায়, মাফ করে দেবেন। বাড়তি গুরুত্ব পাওয়ার মত চিন্তাশীল আমি না।
বলতে চাই, তাই বলে যাই। (কিবোর্ড আর ওয়াল তো একটা পেয়েছি)

No comments:

Post a Comment